শেখ হাসিনার প্রার্থী এমপি মানিক ,জয়া সেনের এলাকায় জয়ী ।মন্ত্রী এম এ মান্নান এর এলাকায় পরাজিত ।

বিশেষ প্রতিনিধিঃ পরিকল্পনামন্ত্রীর নিষ্ক্রিয়তাই সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পরাজয়ের অন্যতম কারণ- এমনটাই মনে করছেন দলের কয়েকজন নীতিনির্ধারক নেতা। গত সোমবার জেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার প্রাথমিক মূল্যায়নে এমন বিশ্নেষণ করা হয়েছে।

সেখানে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ছাড়াও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সরকারী ও বেসরকারী গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারী পূর্ব থেকেই ছিল সুনামগঞ্জের নির্বাচনের উপর। মন্ত্রীর পেছনে কেন্দ্র থেকে জেলা উপজেলা পর্যন্ত দলীয় লোকদেরও কড়া প্রহরা ছিল।

এদিকে জেলা আওয়ামীলীগ,উপজেলা আওয়ামীলীগের এবং তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলছেন,মন্ত্রী আসলে আওয়ামীলীগের সাথে নেই। তিনি তার নিজ নির্বাচনী এলাকা ছাড়াও জেলা সদরে একশ্রেণির সুবিধাভোগীদের নিয়ে মান্নানলীগ প্রতিষ্ঠায় উঠেপড়ে লেগেছেন। দলের জন্য তার ন্যুনতম দরদ নেই।

যে কারনে তার মঞ্চে সুবিধাভোগী নেতারা দলের সর্বাধিক নির্বাচিত এমপি ও সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা মুহিবুর রহমান মানিক ও ড.জয়াসেন গুপ্তা এমপির বিরুদ্ধে বিষোদঘার করলেও তিনি তাদের বিরুদ্ধে কোন ভূমিকা না রেখে উল্টো তাদেরকে উৎসাহ যুগিয়ে যাচ্ছেন। তার ব্যর্থতার কারণে বিগত উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলায় বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছে। জগন্নাথপুর পৌর নির্বাচনেও বিএনপির বিজয়ে তিনি আনন্দ উপভোগ করেছেন। জেলা,উপজেলাতো দূরের কথা তৃণমূল পর্যায়ের আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের সাথে তার আদৌ কোন সম্পর্ক নেই বললেই চলে।

এছাড়া জেলা পরিষদ নির্বাচনের আগে জেলা সদরে আওয়ামীলীগের কার্যকরী কমিটির সভায় তিনি উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নুরুল হুদা মুকুট যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে মনোনয়নপত্র স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করে নেন। এ ব্যাপারে জেলা কমিটি দলের সিনিয়র সদস্য হিসেবে মন্ত্রীকে দায়িত্ব প্রদান করে। কিন্তু মন্ত্রী এই গুরুদায়িত্ব পালন না করে বিদ্রোহী প্রার্থীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য উৎসাহ যুগিয়েছেন। যে কারণে সংবাদ সম্মেলন করে মুকুট বলেছেন তাকে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের কথা কেউই বলেনি।

দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত ও মনোনিত প্রার্থীর বিরোধীতা করার এর চাইতে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে। যা অনায়াসেই মন্ত্রী সকলের সামনে করে দেখিয়েছেন। যেকারণে জেলা পরিষদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জে দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের জন্য পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানকে দুষছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। পরিকল্পনামন্ত্রী সুনামগঞ্জ-৩ আসনের এমপি। এ আসনের জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী ৮০ ভোট পেয়েছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী পেয়েছেন ১৪৪ ভোট, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ৬৪।

মুহিবুর রহমান মানিকের দুইটি নির্বাচনি উপজেলায় শেখ হাসিনা মনোনিত প্রার্থী ভোট পেয়েছেন ১৯৯ ভোট আর আওয়ামীলীগ বিদ্রোহী প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ১০০ ভোট ।শেখ হাসিনার প্রার্থী পেয়েছেন ৯৯ ভোট বেশী ।আর জয়াসেনের দুইটি নির্বাচনি উপজেলায় শেখ হাসিনার মনোনিত প্রার্থীর ভোট পেয়েছেন ১১২ ভোট আর বিদ্রোহী প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৭৩ ভোট । শেখ হাসিনা মনোনিত প্রার্থী পেয়েছেন ৩৯ ভোট বেশী ।

এই জেলার অন্য ৬টি উপজেলায় প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল খুব কাছাকাছি। এই জেলায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী মাত্র ৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।

সে ক্ষেত্রে জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ভোটের ব্যবধান কাছাকাছি থাকলে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয় পেতেন বলে মনে করছেন নেতারা। তাঁদের দৃষ্টিতে পরিকল্পনামন্ত্রীর কার্যকর ভূমিকা থাকলে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যেত।

তা ছাড়া দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য আজিজুস সামাদ আজাদ ডনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কোনো কোনো নেতা। আজিজুস সামাদ আজাদ ডনের বাড়িও জগন্নাথপুরে। তিনি নির্বাচনে খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনে বিজয়ী বিদ্রোহী প্রার্থী নুরুল হুদা মুকুট জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি। তিনি গত নির্বাচনেও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এনামুল কবির ইমনের বিরুদ্ধে জয় পেয়েছিলেন।

ব্যারিস্টার ইমন এবার এই নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন ।কিন্ত কালো টাকা এবং প্রাসাদ ষড়যন্তের কাছে হেরে যান ।এবার ইমনের বড় ভাই অ্যাডভোকেট খায়রুল কবির রুমেন ছিলেন দলীয় প্রার্থী। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। কিন্তু আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা তাঁর পক্ষে খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রথমে নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে প্রচার কার্যক্রমে অংশ নিলেও শেষদিকে অংশ নিতে পারেননি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান । কিন্ত টেলিআলাপে ভোটের জন্য ভোটারদের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ করে কাজ করেছেন ।এদিকে ড.খায়রুল কবীর রুমেন এর আইনজীবীরা উচ্চ আদালতের দারস্থ হতে যাচ্ছেন। তারা মন্ত্রীকে আদালতের কাঠগড়ায় দাড় করানো যায় কিনা ? সে ব্যাপারে আলোচনাসহ উপর মহলের সিদ্বান্ত নেয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

তারা এমনও বলছেন,সুনামগঞ্জ প্রশাসন জগন্নাথপুর উপজেলা সদরে স্কুল কলেজসহ ভোট গ্রহনের অনেক সুবিধাজনক স্থান থাকার পরও কেন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অফিস পাড়ায় ভোটকেন্দ্র স্থাপন করতে গেলেন। এই কেন্দ্র স্থাপনে মন্ত্রীর কোন পূর্ব সিদ্ধান্ত ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এমনকি জগন্নাথপুরে ইভিএম এবং মেনুয়েলি (ব্যালটে )ভোট গ্রহন করার অভিযোগ করা হয়েছে । যতদূর জানতে পারা যায় ইভিএমএ যেখানে ভোট করা হয় সেখানে মেনুয়েলি (ব্যালটে )ভোট নেওয়ার কোন সুযোগ নেই ।এটা কি আরেক ষড়যন্ত নয় কি ?

জেলা আওয়ামীলীগ নেতা কামরুল হাসান যথার্থই বলেছেন,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মূল দলের চাইতে, বিদ্রোহীদের দল, দিন দিন বড় হচ্ছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, সর্বশেষ জেলা পরিষদ নির্বাচন, দলের সভানেত্রী জননেত্রী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ, আদেশ, অমান্য করে, বিদ্রোহীরা এখন কাউকে পরোয়া করছে না, সামনে সংসদ নির্বাচন বিদ্রোহীরা সেই ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি মনে করি দলের সর্বোচ্চ ফোরাম এখনই তাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত গর্ব করে একসময় বলতেন বাঘে ধরলে ছাড়ে কিন্তু শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়েনা। এখন প্রশ্ন হলো শেখ হাসিনা এমপি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি হিসেবে দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে শৃঙ্খলা ভংগকারীদের বিরুদ্ধে আদৌ কোন পদক্ষেপ নেবেন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *